বাংলাদেশে ভেড়া পালন পদ্ধতি

 বাংলাদেশের জলবায়ু মূলত উষ্ণ—আর্দ্র জলবায়ু যা উন্নত পশম উৎপাদন ও অধিক মাংস উৎপাদনশীল জাতের ভেড়া পালন উপযোগী নয়। একারণে এদেশের আবহাওয়াতে সহনশীল দেশীয় ভেড়ার খামার গড়ে উঠেছে। ভেড়া সহজেই বিভিন্ন আবহাওয়ায় সহনশীল হওয়ায় এবং এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অধিক হওয়ায় সম্ভবনাময় ভেড়া পালন এদেশের কিছু অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

ভেড়া পালন পদ্ধতি বাংলাদেশের অঞ্চল ভেদে বা সামগ্রিক ভাবে ভিন্নতর। এসকল পালন/উৎপাদন পদ্ধতি কয়েক ভাবে ভাগ করা যায়। যথাঃ

১। আধা নিবিড় ভেড়া পালন পদ্ধতি

এ পদ্ধতি সারাদেশেই দেখা যায়। খামারিগণ  ২—৬ টি ভেড়া পালন করে। ভেড়া রাতের বেলা গরু—ছাগলের ঘরে অবস্থান করে এবং দিনের বেলা মাঠে, বাগানে, বেড়িবাধঁ বা রাস্তার ধারে চরে। এদেরকে সকালে বা সন্ধ্যায় ভাতের মাড় এবং ভূসি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এসকল খামারে ইনব্রিডিং সমস্যা বেশী।

ভেড়া পালন পদ্ধতি

আধা নিবিড় ভেড়া পালন পদ্ধতি

২। সম্পূর্ণ ছেড়ে পালা ক্ষুদ্র বাণিজ্যিকভাবে ভেড়া পালন পদ্ধতি

এক্ষেত্রে ১৫—৪০ টি ভেড়া বাণিজ্যিকভাবে পালন করা হয়। খামারিগণ দিনের বেলা ভেড়ার পাল নিয়ে মাঠে, বাগানে, রাস্তার ধারে চরায়। সকালে বা সন্ধ্যায় ভাতের মাড় এবং ভূসি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বছরে ১—২ বার পশম সংগ্রহ করা হয়।

৩। বরেন্দ্র এলাকার আধা নিবিড় বাণিজ্যিক ভেড়া পালন পদ্ধতি

এধরণের খামার সাধারণত অপেক্ষাকৃত সচ্ছল খামারিগন দ্বারা পরিচালিত হয়। এ সকল খামারে সময়ভেদে ৫০—১৫০ ভেড়া প্রতিপালন করা হয়। এক্ষেত্রে ১—২ জন রাখাল ভেড়ার খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ভেড়াকে চরানো ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকে। আমন ও রবিশস্য কাটার পর ভেড়া মাঠে চড়ে বেড়ায় এবং ঝরা ধান, ছোলা, খেসারী ও নতুন গজানো ঘাস খায়। তাছাড়া বাগানে, ঝোঁপে, রাস্তার ধারেও ভেড়া চড়ানো হয়। এ পদ্ধতিতে পালিত ভেড়াকে খড় ও দানাদার খাদ্য প্রদান করা হয়। বছরে ৩—৪ বার পশম সংগ্রহ করা হয় যা সাধারণত নিম্নমাণের কম্বল তৈরীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

৪। চরে সম্পূর্ণ ছেড়ে ভেড়া পালন পদ্ধতি

এ ধরনের ভেড়া উপাদন পদ্ধতিতে লবণাক্ত স্যাঁত—স্যাঁতে চরে ভেড়া সম্পূর্ণ ছেড়ে পালন করা হয়। ভেড়া পালনের জন্য ভেড়ার সংখ্যা ভেদে ২—৫ জন রাখাল থাকে। ভেড়া সারাদিন কর্দমাক্ত ও লবণাক্ত মাঠে চড়ে বেড়ায়, ঘাস খায়, ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের লতা—পাতা খায়। জোয়ার এবং রাতের বেলায় কেল্লায় অবস্থান করে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে (ঈদ/পূজা) ভেড়া বিক্রি হয়ে থাকে। এ পালন পদ্ধতিতে কোন প্রকার দানাদার খাদ্য সরবরাহ করা হয় না । যদিও এদের উৎপাদনশীলতা কম কিন্তু এই ধরণের পালন পদ্ধতি লাভজনক।

ভেড়া পালন পদ্ধতি

উন্মুক্ত ভেড়া পালন পদ্ধতি

 

৫। সমন্বিত খামারে ভেড়া পালন পদ্ধতি

এ পদ্ধতিতে গরু—ছাগল এর সাথে মিশ্রভাবে ভেড়া পালন করা হয়।

গরুর সাথে মিশ্র ভেড়া পালন পদ্ধতি

ছাগলের সাথে মিশ্র ভেড়া পালন পদ্ধতি

 

৬। নিবিড় ভেড়া পালন পদ্ধতি

নিবিড়  পদ্ধতিতে ভেড়া সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় পালন করা হয়। ভেড়াকে প্রয়োজনীয় দানাদার খাদ্য, ঘাস ও পানি সরবরাহ করা হয়। এ পদ্ধতি লাভজনক ও সম্ভবনাময়। বর্তমানে দেশে এ পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়েছে যা বাস্তবায়ন করা গেলে ভেড়া পালনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

গর্ভবতী ভেড়ার যত্ন

গর্ভাবস্থায় প্রথম পযার্য়ে ভেড়ীকে ২য় কোন ভেড়ার কাছে নেয়া যাবে না। গর্ভাবস্থায় শেষ পর্যায়ে নরম বিছানা দিতে হবে। গর্ভবতী ভেড়ীকে আলাদা রেখে পর‌্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে গমের ভুষি, কাচা ঘাস, তিলের খৈল, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাদ্য প্রদান করতে হবে।

প্রসব পূর্ববর্তী, প্রসবকালীন প্রসব পরবর্তী ব্যবস্থাপনা

গর্ভধারণের শেষ সপ্তাহে ভেড়ীর বিশেষ যত্নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এসময় আবদ্ধ অবস্থায় পালনকৃত ভেড়ীকে মেটারনিটি প্যান বা প্রসব ঘরে রাখতে হবে এবং পযার্প্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।

ছাড়া অবস্থায় চরে খাওয়া ভেড়ীকে গভার্বস্থার শেষ ২ সপ্তা্হ বিশেষ নজরে রাখতে হবে।

এসময়টাতে কোনভাবেই ভেড়ীকে পাঁঠার কাছাকাছি রাখা যাবে না।

বাচ্চা প্রসবের লক্ষণ দেখা গেলে কাছাকাছি অবস্থান করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় জীবানুমুক্ত কাঁচি, আয়োডিন, সূতা প্রস্তুত রাখতে হবে।

বাচ্চা জন্মদানকালে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটলে বা বাচ্চা আটকিয়ে গেলে দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের সাহায্য নিতে হবে।

বাচ্চা জন্মানোর পর ভেড়ীকে পযার্প্ত পরিমাণে স্যালাইন মেশানো পানি সরবরাহ করতে হবে।

প্রসব পরবর্তী ৬—১২ ঘন্টার মধ্যে গর্ভফুল না পড়লে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিতে হবে।

বাচ্চা ভেড়ার যত্ন

বাচ্চা জন্মানোর পর অতিদ্রুত বাচ্চার নাক ও মুখ পরিষ্কার সূতি কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

বাচ্চার জন্মের পর মা ভেড়ী যাতে বাচ্চার শরীর চেটে পরিষ্কার করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। কেননা, এতে বাচ্চার শ্বাস—প্রশ্বাস শুরুর ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।

বাচ্চা জন্মানোর পর যত দ্রুত সম্ভব প্রতিটি বাচ্চা যাতে শাল দুধ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

ভেড়ার প্রজনন ব্যবস্থাপনা

ভেড়ার খামার লাভজনক ও টেকসই করতে হলে সঠিক পাঠা নিবার্চন, ভেড়ী নিবার্চন, প্রজনন বয়স নিধার্রন, পালে ভেড়ী ও পাঁঠার অনুপাত নিধার্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সঠিক পাঁঠা ভেড়া নিবার্চন

সঠিক পাঁঠা নিবার্চন একটি ভেড়ার খামারের মৌলিক বিষয়। কেননা সঠিক পাঁঠা ভেড়া নিবার্চন করা গেলে খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, প্রতি প্রজননে বাচ্চা উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পায়, উৎপাদিত বাচ্চা সুস্থ ও সবল হয় এবং খামারে বাচ্চা মৃত্যুর হার কম হয়। একটি পাঁঠা ভেড়া নিবার্চনে যে সকল বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় আনতে হয় তা হলোঃ

 নিবার্চনের সময় পাঁঠার বয়স ১২—১৪ মাস হতে হবে।

 নির্বাচিত পাঁঠা ভেড়া অধিক উৎপাদনশীল বংশের হতে হবে। অর্থ্যাৎ তার মা, দাদী ও নানীর অধিক উৎপাদনশীলতার ইতিহাস ও উৎপাদিত বাচ্চাতে কম মৃত্যুর হার (৫% এর কম) থাকতে হবে।

 পাঁঠা ভেড়া প্রজনন রোগসহ অন্যান্য সকল ধরণের রোগ মুক্ত হতে হবে।

 পাঁঠা ভেড়ার অন্ডকোষ সুগঠিত হতে হবে। পিছনের পা সুঠাম ও শক্তিশালী হতে হবে।

 পাঁঠা তুলনামুলকভাবে আকারে বড় ও সোর্য বীর্যশালী হওয়া উচিত।

প্রজনন ভেড়ী নিবার্চন

বাণিজ্যিক খামারে সঠিক প্রজনন ভেড়ী নিবার্চন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা সঠিক ভেড়ী নিবার্চন করা গেলে খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, প্রজননে বাচ্চা উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পায়, উৎপাদিত বাচ্চা সুস্থ ও সবল হয় এবং খামারে বাচ্চা মৃত্যুর হার কম হয়। একটি ভেড়ী নিবার্চনে যে সকল বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় আনতে হয় তা হলোঃ

 নিবার্চনের সময় ভেড়ী বয়স ৯—১৩ মাস হতে হবে।

 ভেড়ী অধিক উৎপাদনশীল বংশের হতে হবে। অর্থ্যাৎ তার মা, দাদী ও নানীর অধিক উৎপাদনশীলতার ইতিহাস ও উৎপাদিত বাচ্চাতে কম মৃত্যুর হার (৫% এর কম) থাকতে হবে। তাছাড়া মা, দাদী ও নানীর বছরে ২ বার বাচ্চা প্রদান ও প্রতিবারে ২ টি বাচ্চা প্রদানের ইতিহাস থাকতে হবে।

 ভেড়ী প্রজনন রোগসহ অন্যান্য সকল ধরণের রোগ মুক্ত হতে হবে।

 ওলান সুগঠিত, অধিক দুধ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন, বাঁট সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

 শরীর অনেকটা ত্রিকোনাকৃতি ও পা সুঠাম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

ভেড়ী গরম হওয়ার লক্ষণ ও পাল দেওয়ার আদর্শ সময়ঃ

 ভেড়ী গরম হলে সোজাভাবে দাড়িয়ে থেকে লেজ বাঁকিয়ে রাখে এবং ঘন ঘন লেজ নাড়ে।

 ভেড়ীর যোনীদ্বার লাল ও ফোলা হবে এবং যোনীদ্বার দিয়ে সাদাটে মিউকাস বের হবে।

 ভেড়ীর খাওয়া দাওয়া কমে যায়, পাঠার গা ঘেষে অবস্থান করে, ডাকাডাকি করে।

 ভেড়ী গরম হওয়ার ১২—২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রজনন করানো জরুরী।

 পাঠার ত্রুটিপূর্ণ শুক্রানু ও ভেড়ীর ত্রুটিপূর্ণ ডিম্বানুর কারণে ডিম নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হতে পারে।

 অপুষ্টিজনিত কারণেও ডিম নিষিক্ত না হলে ভেড়ী বার বার গরম হতে পারে। তাছাড়া হরমোণের অসামঞ্জস্যতার কারণে বা অতিরিক্ত গরম ও অসহনীয় অবস্থার কারণেও ফার্টিলাইজেশন ব্যাহত হলে ভেড়ী বার বার গরম হতে পারে।

 সুতরাং সঠিক সময়ে পাল দেওয়া ও প্রজনন রোগের ক্ষেত্রে ভেটেরিনারিয়ান দ্বারা চিকিৎসা প্রদান এবং প্রয়োজনে পাঁঠা ভেড়া ও ভেড়ী খামার থেকে বাতিল করতে হবে।

 বারে বারে প্রজননে একই পাঁঠা বা একই পাঠার বীজ ব্যবহারে বিরত থাকতে হবে। ফলে ইন—ব্রিডিং সমস্যা দূর হবে।

 প্রজনন ব্যবস্থাপনায় ভাল পাঁঠা ও ভাল ভেড়ী নিবার্চন করে সিলেকটিভ ব্রিডিং করা গেলে জাত উন্নয়ন করার মাধ্যমে ভেড়ার খামার অধিক লাভজনক ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।