ছাগলের রোগ ও তার প্রতিকার

ছাগলের রোগ ব্যাধি অনেক কম, বিশেষ করে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বিদেশি ছাগলের তুলনায় নিজস্ব জাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের রোগ খুব কম হয়।

ছাগলের রোগ প্রধানত সংক্রামক ও অসংক্রামক এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। বিভিন্ন প্রকার জীবানু যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, মাইকোপ্লাজমা, ফাংগাস, প্রটোজোয়া, ক্লামাইডিয়া ইত্যাদির কারণে যে সব রোগ হয় তাকে সংক্রামক রোগ বলা হয়। কোন জীবানু ছাড়া বংশগত, ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, অপুষ্টি, ঘাটতি জনিত, মেটাবলিক ডিসর্ডার ইত্যাদি কারনে যে সমস্ত রোগ হয় তাকে অসংক্রামক রোগ বলে।

 

ছাগলের সংক্রামক রোগসমুহ

ওলান প্রদাহ বা ছাগলের ম্যাস্টাইটিস রোগ (Mastitis)

কারণ

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, মাইকোপ্লাজমা, ফাংগাসসহ ১৮-২০ ধরণের জীবানু দ্বারা দুগ্ধবতী ছাগলের ম্যাস্টাইটিস বা ওলান প্রদাহ রোগ হয়ে থাকে।

লক্ষণ

  • এ রোগে ছাগীর ওলান লাল হয়ে ফুলে যায়,
  • শক্ত হয়ে যায়,
  • হাত দিয়ে স্পর্শ করলে গরম অনুভূত হয়,
  • দুধ দোহন করলে পাত্রে দুধের তলানি পড়ে,
  • দুধ উৎপাদন কমে যায়। দুধের স্বাদ লবনাক্ত হতে পারে,
  • তীব্র প্রকৃতির রোগে ওলানের ভিতর পুঁজ হতে পারে।
  • পরে দুধের সাথে পুঁজ ও রক্ত আসে এবং দুর্গন্ধ হয়।
  • ওলান ও বাটে ব্যাথা হয়, দুধ দোহন করতে বা বাচ্চাকে টেনে খেতে দিতে চায় না।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। এ রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম্নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় –

  • মাঝে মাঝে ওলানের সব কোয়ার্টারের দুধ কালো কাপড়ে নিয়ে দেখতে হবে কোন তলানি, পুঁজ বা রক্ত আছে কিনা, দুধের রং পরিবর্তন হয়েছে কিনা।
  • প্রসবের আগে ও পরে ছাগীকে সমতল ও নরম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখতে হবে।
  • দুধ দোহনের সময় হাত পরিস্কার করে নিতে হবে। প্রয়োজনে সাবান বা ক্লোরিন সলিউশন ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ছাগল ছানা বড় হয়ে গেলে ওলান থেকে দুধ খেতে দেয়া যাবে না।

 

ছাগলের ধনুষ্টংকার বা টিটেনাস রোগ (Tetanus)

কারণ

যে কোন অপারেশন, খাসীকরণ, বাচ্চা প্রসবের সময় ছাগীতে, ছাগল ছানার নাভীতে ক্ষত সৃষ্টি হলে বা ছাগলের শরীরে যে কোন ক্ষতে ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমন ঘটে তখন টিটেনাস রোগ হয়।

লক্ষণ

টিটেনাস রোগে আক্রান্ত ছাগলের চোয়াল, গলা ও দেহের অন্যান্য অংশের মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায়। দাঁতের মাড়ির সপেশী শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে দাঁত লেগে যাওয়ায়  ছাগল খেতে পারে না। শরীরে খিঁচুনি দেখা যায়, মুখ থেকে লালা ঝরে, প্রথম দিকে দেহের তাপমাত্রা কমে যায়, দেহ শক্ত হয়ে বেঁকে যায়, পা ও ঘাড় শক্ত হয়ে যায় বলে আক্রান্ত ছাগল চলা ফেরা করতে পারে না, এমন কি দাঁড়াতেও পারে না। তীব্র আক্রান্ত ছাগল কয়েকদিনের মধ্যে মারা যায়।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী টিটেনাস  আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

এ রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম্নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় –

  • অবৈজ্ঞানিক উপায়ে জীবানুযুক্ত অস্ত্র দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছাগল ছানাকে খাসী করা যাবে না।
  • খোঁজাকরণ, নাভি কর্তন, লোম কাটাসহ যে কোন ধরণের অপারেশনের সময় ছাগলকে টিটেনাস টক্সয়েড অথবা এন্টি টিটেনাস সিরাম (ATS) ইনজেকশন করতে হবে।
  • ডেটল, সেভলন প্রভৃতি এন্টিসেপটিক দিয়ে ক্ষতস্থান পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
  • এক বছর পর পর দুই বার ছাগীকে এন্টি টিটেনাস সিরাম অথবা টিটেনাস টক্সয়েড ইনজেকশন প্রদান করতে হবে।

ছাগলের তড়কা রোগ বা এ্যানথ্রাক্স (Anthrax)

কারণ

ব্যাসিলাস এ্যানথ্রাসিস নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হয়।

লক্ষণ

অতি তীব্র প্রকৃতির রোগে আক্রান্ত ছাগল অনেক সময়  লক্ষণ প্রকাশের আগেই মারা যায়। ছাগল টলতে টলতে পড়ে গিয়ে হাঁপাতে থাকে, খিঁচুনি দেখা দেয় এবং মারা যায়।

তীব্র প্রকৃতির রোগে ছাগলের শরীরের তাপমাত্রা (১০৩– ১০৭ ফারেনহাইট) বেড়ে যায়, খাওয়া দাওয়া বন্দ করে দেয়, জাবর কাটে না, শ্বাস কষ্ট হয়, নাক মুখ দিয়ে লালা ঝরে, পেট ফুলে ওঠে, রক্তমিশ্রিত পায়খানা হয়।

মৃত ছাগলের নাক, মুখ, মলদ্বার দিয়ে রক্তমিশ্রিত ফেনা বের হয়।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

তড়কা একটি মারাত্মক রোগ। রোগ লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

এ রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম্নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় –

  • মৃত ছাগলকে পুড়িয়ে বা মাটির গর্তে কমপক্ষে ৬ ফুট গভীরে চুন, ব্লিচিং পাউডার দিয়ে চাপা দিতে হবে।
  • কোন অবস্থাতেই মৃত ছাগলের চামড়া ছাড়ানো যাবে না। কারণ, চামড়া ছাড়ালে এ রোগের জীবানু মাটিতে বা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর চামড়াও এ রোগের জীবানু বহন করে। এ্যানথ্রাক্স একটি জুনোটিক রোগ অর্থাৎ পশু থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। তাই চামড়া ছাড়ানোর সময় বা পরবর্তীতে চামড়া থেকে এই রোগের জীবানু মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে।
  • আক্রান্ত প্রাণি বা মৃত দেহ কোন অবস্থাতেই ব্যবচ্ছেদ করা যাবে না।
  • মৃত ছাগলের ব্যবহৃত সকল জিনিস পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত ছাগলকে আলাদা করে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
  • মৃত বা আক্রান্ত ছাগলের সংস্পর্শে আসা অন্যান্য ছাগলকে বিশেষ নজরদারিতে রাখতে হবে।
  • অসুস্থ ছাগলকে বিক্রি করা যাবে না, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করানো যাবে না।
  • সুস্থ ছাগলকে নিয়মিত এক বছর পর পর তড়কা টিকা বা এ্যানথ্রাক্স রোগের টিকা দিতে হবে।

ছাগলের এন্টারোটক্সেমিয়া রোগ (Enterotoxemia in goat)

এন্টারটক্সেমিয়া সব বয়সের ভেড়া ও ছাগলের একটি মারাত্মক রোগ। এটিকে ওভার ইটিং ডিজিজও বলা হয়।

কারণ

ক্লোস্ট্রিডিয়াম প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া সৃষ্ট টক্সিন দ্বারা ছাগলের এন্টারোটক্সেমিয়া রোগ হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি সাধারণত সমস্ত ভেড়া এবং ছাগলের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টে কম সংখ্যায় পাওয়া যায়। যদি তাই হয়, কখন এবং কেন তারা রোগ সৃষ্টি করে?

এই জীবানুগুলি সাধারণত ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্ত্রে খুব কম মাত্রায় এবং স্বাভাবিক, সুস্থ প্রাণীতে তুলনামূলকভাবে নিরীহ অবস্থায় থাকে।

ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদান্ত্রের পরিবেশ পরিবর্তন হলে অর্থাৎ ছাগল বা ভেড়ার খাদ্যের পরিবর্তন হলে জীবানুর মধ্যেও পরিবর্তন দেখা দেয়। আর তা-ই ছাগল ভেড়ায় এই জীবানু দ্বারা রোগ সৃষ্টিতে ভুমিকা রাখে।

সাধারণত, যে পরিবর্তনটি রোগের সূত্রপাত করে তা হল শস্য, প্রোটিন সম্পূরক, দুধ বা দুধ প্রতিস্থাপনকারী (Milk replacer)  এবং/অথবা ঘাসের পরিমাণ বৃদ্ধি। সম্মিলিতভাবে এই খাদ্যগুলি স্টার্চ, চিনি এবং/অথবা প্রোটিন সমৃদ্ধ।

পুষ্টির অস্বাভাবিক উচ্চ মাত্রা অন্ত্রে পৌঁছালে ক্লোস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেনের বিস্ফোরক বৃদ্ধি ঘটে –  অন্ত্রের মধ্যে জীবানুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জীবানুর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী টক্সিন (ব্যাকটেরিয়াল বিষ) নির্গত করে যা প্রাণীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই টক্সিনগুলি অন্ত্রের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে প্রাণহানি ঘটতে পারে, বিশেষ করে যাদের টিকা দেওয়া হয়নি।

লক্ষণ

ছাগলের এন্টারোটক্সেমিয়ার লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • এন্টারোটক্সেমিয়া রোগে আক্রান্ত ছাগল শরীরের ভার বহন করতে পারে না, চারণভূমিতে হাঁটার সময় কাঁপতে থাকে।
  • পশুরা হঠাৎ করে খাবার ছেড়ে দিতে পারে এবং অলস হয়ে যেতে পারে।
  • খিঁচুনি দেখা যায়।
  • মুখ দিয়ে লালা ঝরে।
  • পেট ফুলে ওঠে।
  • দুর্গন্ধযুক্ত ডায়রিয়া হয়, কিছু ক্ষেত্রে মলের মধ্যে রক্ত ​​দেখা যায়।
  • আক্রান্ত প্রাণী পেটে ব্যথার লক্ষণ দেখাতে পারে, তখন পা দিয়ে পেটে লাথি মারে, বার বার শুয়ে পড়ে আবার ওঠে, হাঁপায়, চিৎকার করে।
  • ছাগলের দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকে না, পা প্রসারিত করে ঘাড় দিকে বাঁকা করে পেটের উপর মাথা রেখে পাশ হয়ে শুয়ে থাকে। এই ভঙ্গিটি মস্তিষ্কে বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবের কারণে হয়। সাধারণত এই চিহ্নটি দেখা যাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ছাগলের মৃত্যু ঘটে।
  • তীব্র প্রকৃতির রোগে হঠাৎ কাঁপুনি দিয়ে মারা যায়।
  • যেহেতু এন্টারোটক্সেমিয়া খুব দ্রুত অগ্রসর হতে পারে, তাই কোনো রোগের লক্ষণ ছাড়াই ছাগলকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিকার

রোগ লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসা সফল নাও হতে পারে।

প্রতিরোধ

এন্টারোটক্সেমিয়া রোগের চিকিৎসার চেষ্টা করার চেয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

টিকাদান: এই রোগ প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হল টিকা। ভেড়া ও ছাগলের জন্য এমন একাধিক টিকা পাওয়া যায় যা ক্লোস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেন টাইপ সি এবং ডি দ্বারা উৎপন্ন টক্সিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এই রোগের বিরুদ্ধে নবজাতক প্রাণীদের রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় হল মায়েদের নিয়মিত টিকা দেওয়া, কারণ ব্যাকটেরিয়ার টক্সিনের অ্যান্টিবডিগুলি কোলস্ট্রামের (প্রথম দুধ) মাধ্যমে নবজাতকের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। এবং নবজাতক ছাগল ছানাকে অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমানে কলস্ট্রাম বা শাল দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে হবে। বাড়ন্ত ছাগলকে সাধারণত ছয় থেকে দশ সপ্তাহ বয়সে প্রথম বার টিকা দেওয়া হয় এবং সাধারণত পরে আরও দুটি পুনরাবৃত্তি (বুস্টার) টিকা দেওয়া হয়।

খাদ্য খাওয়ানোর কৌশল: স্মার্ট ফিডিং কৌশল এই রোগের সম্ভাবনাকে সীমিত করতে সক্ষম। যেহেতু অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ মাত্রার স্টার্চ, চিনি বা প্রোটিন গ্রহণের প্রতিক্রিয়া হিসাবে কার্যকারক ব্যাকটেরিয়াগুলি অন্ত্রে বৃদ্ধি পায়, তাই উচ্চ মাত্রায় পুষ্টি রয়েছে এমন খাদ্যদ্রব্য খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দ্রুত বৃদ্ধির প্ররোচনায় ছাগলকে উচ্চ মাত্রায় কমপ্লিট রেশন অতিরিক্ত খাওয়ানো হলে এই রোগের সূত্রপাত হতে পারে।

এই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ফিড স্টাফগুলিকে খাওয়ানোর সময়  প্রতিটি ছাগলের জন্য দৈনিক বরাদ্দ দিনে এক বারে না দিয়ে অল্প অল্প করে তিন চার বারে ভাগ করে দিতে হবে। কনসেন্ট্রেট খাওয়ানোর আগে খড় খাওয়ানো ভালো, এতে পেট আগে থেকেই ঝুঁকিহীন খাবারে পুর্ণ থাকে এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ খাবার অতিরিক্ত খাওয়ার সম্ভাবনাকে সীমিত করতে পারে।

খাবারে পরিবর্তন আনতে হলে সেটা ধীরে ধীরে করতে হবে। এটি পাকস্থলীর ব্যাকটেরিয়াকে খাদ্যের সাথে মিটমাট করতে সাহায্য করে।

হঠাৎ করে খাদ্য পরিবর্তন করা যাবে না। খাবারে পুরোপুরি পরিবর্তন আনতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় নিতে হবে।

সবল পশু দুর্বলগুলিকে হঠিয়ে বেশি পরিমানে দানাদার খাদ্য খেয়ে নিতে পারে। তাই বয়স, স্বাস্থ্য বা মেজাজ অনুযায়ী পশুকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে খাদ্য পরিবেশন করতে হবে।

ছাগলের ক্ষুরা রোগ‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍   (FMF in Goat)

কারণ

ক্ষুরা রোগ ছাগলের একটি ছৌঁয়াচে সংক্রামক রোগ। এ রোগে মৃত্যুর হার কম হলেও উৎপাদন মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ। এই ভাইরাসের নাম ফুট-এন্ড-মাউথ ডিজিজ ভাইরাস (FMDVs)। এটি Picornaviridae পরিবারের Aphthovirus গণের একটি প্রজাতি।

লক্ষণ

  • ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (এফএমডি) ভাইরাস জিহ্বা, মুখ এবং পায়ের এপিথেলিয়ামে ফোস্কা সৃষ্টি করে।
  • ছাগলের দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। শরীরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে।
  • মুখ ও নাক দিয়ে অনবরত লালা ঝরে।
  • ফোস্কা ফেটে গিয়ে ক্ষত বা ঘা হয়।
  • ঠিকমত কিছু খেতে পারে না।
  • পায়ের ব্যথায় ছাগলের হাঁটতে ও দাঁড়াতে কষ্ট হয়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটে।
  • অনেক সময় ক্ষতে মাছি ডিম পেড়ে কীটের জন্ম দেয়।
  • দুগ্ধবতী ছাগীর দুধ উৎপাদন কমে যায়।
  • গর্ভবতী ছাগীর  গর্ভপাত হতে পারে।
  • বাচ্চা ছাগলের হৃদপিন্ডের মাংসপেশী আক্রান্ত হওয়ায় মৃত্যু ঘটে।

 

প্রতিকার

  • ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত ছাগলকে সুস্থ ছাগল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
  • আক্রান্ত ছাগলকে শুকনো ও পরিস্কার স্থানে রাখতে হবে।
  • ক্ষতস্থান ৩% আইওসান বা ০,১% পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট অথবা ৫% কপার সালফেট দ্রবন দিয়ে দৈনিক ৩ বার ৪-৫ দিন ধুয়ে দিতে হবে।
  • ধোয়ার পর ক্ষতস্থানে এন্টিসেপটিক পাউডার বা ক্রীম লাগাতে হবে।
  • ক্ষতস্থানে যাতে মাছি না বসে সে জন্য পায়ের ক্ষতে তারপিন তেল বা ন্যাপথালিনের গুড়া বা কর্পুর লাগাতে হবে।
  • ছাগলকে নরম খাবার যেমন ভাতের মাড়, জাউ, কচি নরম ঘাস ইত্যাদি খেতে দিতে হবে।
  • রোগ লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

প্রতিরোধ

ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত ছাগলের মল-মূত্র, বিছানা ও ব্যবহৃত উচছিষ্ট খাদ্যদ্রব্য মাটিতে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মৃত ছাগলকে গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন অবস্থায়ই মৃত ছাগলের চামড়া ছাড়ানো যাবে না বা মৃত দেহ যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না। অসুস্থ ছাগলকে স্থানান্তর করা যাবে না বা বিক্রি করা যাবে না। এই রোগ প্রতিরোধ করার জন্য  সুস্থ ছাগলকে নিয়মিত ক্ষুরা রোগের টিকা দিতে হবে।

ছাগলের পিপিআর রোগ (PPR in Goat)

পিপিআর ছাগের একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। পিপিআর রোগকে ছাগলের প্লেগ রোগও বলা হয়।

কারণ

Peste des petits ruminants (PPR) ভাইরাস দ্বারা পিপিআর রোগ হয়। পিপিআর ভাইরাস রিন্ডারপেস্ট ভাইরাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এটি একটি মর্বিলি ভাইরাস।

পিপিআর রোগের লক্ষণ

ছাগলের রোগ পিপিআর

ছাগলের রোগ – পিপিআর

  • শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
  • নাক দিয়ে শ্লেষ্মা ঝরে। নাকের ভিতর শ্লেষ্মা জমে থাকে।
  • পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া দেখা দেয়।
  • জিহ্বা, দাঁতের মাড়ি, মাজল ও মুখের ভিতর ঘা হয়।
  • মলের রং গাঢ় বাদামী হয় এবং মলের সাথে মাঝে মাঝে রক্ত মিশানো মিউকাস আসে।
  • শ্বাস কষ্ট, কাশি প্রভৃতি নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যায়।
  • পিপিআর রোগে প্রথমে শরীরের তাপ মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও শেষের দিকে তাপমাত্রা কমে যায়।
  • সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা না হলে ৫-১০ দিনের মধ্যে ছাগল মারা যায়।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

পিপিআর একটি তীব্র প্রকৃতির রোগ বিধায় এ রোগ প্রতিকার করার চেষ্টা কষ্টসাধ্য, ব্যয়সাধ্য এবং প্রায়শঃই অসফল।

রোগ লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

পিপিআর রোগে আক্রান্ত ছাগলের মল-মূত্র, বিছানা ও ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট খাদ্যদ্রব্য মাটিতে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মৃত ছাগলকে গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন অবস্থায়ই মৃত দেহ যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না। অসুস্থ ছাগলকে স্থানান্তর করা যাবে না বা বিক্রি করা যাবে না।

সুস্থ ছাগলকে নিয়মিত পিপিআর রোগের প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে।

ছাগলের কন্টাজিয়াস একথাইমা বা ঠোঁটের ক্ষত

কন্টাজিয়াস একথাইমা হচ্ছে ছাগলের একটি ভাইরাস জনিত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ছাগলের নাক ও মুখের চারিপাশে ফুসকুড়ি হয়। ঠোঁট ও মাড়িতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ক্ষতের জন্য ঠোঁট ফুলে যায়। অনেক সময় চোখ, ওলান, মলদ্বার ও পায়ের ক্ষুরের উপরের চামড়ায় ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় এই ক্ষত অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয়ে রোগ জটিল আকার ধারণ করে।

একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

আক্রান্ত ক্ষত ফিটকিরি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত স্থানে মিথাইল ব্লু বা ক্রিস্টাল ভায়োলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।

 গোট পক্স

গোট পক্স ছাগলের একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাস জনিত ছোঁয়াচে রোগ।

আক্রান্ত ছাগলের জ্বর হয়। চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়ে, মুখ দিয়ে লালা ঝরে। সারা শরীরে ফোস্কা পড়ে। সাধারণত মুখের চারপাশে, নাকে, মাজলে, মুখের ভিতরে, দাঁতের মাড়িতে, কানে, গলায়, ওলানে ও বাঁটে যেখানে পশম কম এমন জায়গায় বসন্তের গুটি বা ফোস্কা দেখা যায়।

ক্ষতে এন্টিবায়োটিক পাউডার বা কর্টিসোন ক্রীম লাগানো যায়। ছাগলের রোগ লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে অসুস্থ ছাগলকে পাল থেকে আলাদা করে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

সুস্থ ছাগলকে গোট পক্স টিকা প্রদান করতে হবে।

 

এসব ছাড়াও ছাগলের নিউমোনিয়া, কৃমি সংক্রমন, বহিঃপরজীবি (যেমন- আঁঠালি, উকঁকুন, মাইট ইত্যাদি) সংক্রমন হতে পারে। প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত ছাগলকে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে এবং যাতে রোগ না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে বা পূর্ব থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

সব সময় মনে রাখতে হবে রোগ হবার পরে তার প্রতিকার করার  চেয়ে রোগ হওয়ার আগে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উত্তম।