ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি

 Law of Diminishing Marginal Utility

মানুষের অভাব অসীম। কিন্তু একটি বিশেষ দ্রব্যের বেলায় এটি ঠিক নয়। কোন নির্দিষ্ট দ্রব্যের বেলায় অভাব সসীম। আজিম কি অসীম পরিমান আম চায়? নাকি একটি নির্দিষ্ট পরিমান পর্যন্ত চায়?

অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোন ব্যক্তি যখন একটি বিশেষ দ্রব্য ক্রমাগতভাবে ভোগ করতে থাকে তখন ঐ দ্রব্যের প্রান্তিক উপযোগ ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকে। মোট উপযোগ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু এই বৃদ্ধির হার ঠিক থাকে না – ক্রমহ্রাসমান হারে বাড়ে। উপযোগের এ বিধিকে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলে।

১৮৯০ সালে অধ্যাপক মার্শাল বলেন, “কোন ব্যক্তি কোন বিশেষ দ্রব্যের মজুদ বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত উপযোগ লাভ করে তা মজুদ বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।” কোন ব্যক্তি যখন ক্রমাগতভাবে অধিক পরিমানে ভোগ করতে থাকে তখন সে ঐ দ্রব্যের অতিরিক্ত একক গুলি থেকে ক্রমশ কম উপযোগ লাভ করে এবং এর জন্য ক্রমশ কম মূল্য দিতে রাজি থাকে। ভোগের এ নিয়মটিকে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলে।

সম্পর্ককে (বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে, একসাথে থাকা ইত্যাদি) যারা ভোগের দৃষ্টিতে দেখে তারা সঙ্গীর সান্নিধ্য থেকে ক্রমহ্রাসমান হারে উপযোগ পায়। এক সময় প্রান্তিক উপযোগ হ্রাস পেতে পেতে শূন্যের কোটায় পৌঁছে এমনকি ঋণাত্মক হয়ে যায়। তখন সম্পর্ক ধরে রাখা যায় না। একটি সেট-আপ সম্পর্কের ব্রেক-আপের অন্যতম কারণ এটি।

ক্রমহ্রাসমান উপযোগ বিধির অনুমিত শর্ত

  • ভোক্তার আচরণ যুক্তিশীল। পাগলামির বিধি হয় না।
  • এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভোগ বিবেচনা করা হয়।
  • ভোগকারীর রুচি, পছন্দ, আয় স্থির ধরে এই বিধি বিবেচনা করা হয়।
  • অর্থের প্রান্তিক উপযোগ স্থির ধরা হয়।
  • সংখ্যাবাচক উপযোগ এই বিধির আওতাভুক্ত।
  • উপযোগ অপেক্ষাকসমুহ পরস্পর স্বাধীন।

তালিকা দ্বারা ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বিশ্লেষণ

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিকে নিম্নের তালিকা দ্বারা বিশ্লেষণ করা হলো –

দ্রব্যের একক

মোট উপযোগ (টাকা)

প্রান্তিক উপযোগ (টাকা)

১ম একক

২৫ টাকা

২৫ টাকা

২য় একক

৪৫ টাকা

২০ টাকা

৩য় একক

৬০ টাকা

১৫ টাকা

৪র্থ একক

৭০ টাকা

১০ টাকা

৫ম একক

৭৫ টাকা

৫ টাকা

৬ষ্ঠ একক

৭৫ টাকা

০ টাকা

৭ম একক

৭০ টাকা

-৫ টাকা

 

উপরের তালিকায় দেখা যাচ্ছে যে, ভোক্তা ১ম একক ভোগ করে ২৫ টাকার সমান উপযোগ পাচ্ছে। তাই সে ১ম এককের জন্য ২৫ টাকা মূল্য দিতে রাজী। ২য় এককের জন্য সে ২৫ টাকা দিতে রাজী নয়। কারণ সে ২য় একক দ্রব্য থেকে ২৫ টাকার সমান উপযোগ পাচ্ছে না। সে এখানে ২০ টাকার সমান (২৫ টাকার কম) উপযোগ পাচ্ছে। অনুরূপভাবে ৩য় একক ভোগ করার সময় সে ১৫ টাকার সমান (২০ টাকার কম) উপযোগ পাচ্ছে।

অর্থাৎ, ঐ দ্রব্যের ভোগ সে যতই বাড়াচ্ছে তার প্রান্তিক উপযোগ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এক পর্যায়ে এসে (এখানে ৬ষ্ঠ এককে) প্রান্তিক উপযোগ দাড়াচ্ছে ০ (শূন্য) তে। এরপরও ভোগ বাড়াতে থাকলে প্রান্তিক উপযোগ ঋণাত্মক হতে থাকবে।

সুতরাং, তালিকায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ভোগকৃত দ্রব্যের একক যতই বাড়ে মোট উপযোগ বাড়তে থাকে এবং প্রান্তিক উপযোগ কমতে থাকে। ভোগের এ নিয়মকে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি বলা হয়।

রেখাচিত্রের সাহায্যে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির ব্যাখ্যা

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিকে রেখাচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করলে তাকে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ রেখা বলে।

উপরের তালিকাকে রেখাচিত্রে রূপান্তর করে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির ব্যাখ্যা করা হলো –

 

প্রান্তিক উপযোগ রেখা

চিত্রঃ প্রান্তিক উপযোগ রেখা

চিত্রের OX অক্ষে দ্রব্যের পরিমান এবং OY অক্ষে উপযোগ দেখানো হয়েছে। UU রেখাটি হচ্ছে প্রান্তিক উপযোগ রেখা।

ভোক্তা ১ম একক অর্থাৎ OA পরিমান ভোগ করে ২৫ টাকার সমান AL উপযোগ পায়।

অনুরূপভাবে, AB, BC, CD এবং DE একক দ্রব্য ভোগ করে যথাক্রমে ২০, ১৫, ১০ ও ৫ টাকার সমান BM, CN, DP এবং EQ উপযোগ পায়।

EF একক দ্রব্য ভোগ করে প্রাপ্ত উপযোগ ০ (শূন্য)।

এখন, M, N, P, Q, F বিন্দু দিয়ে UU রেখা টানলে সেটি হচ্ছে প্রান্তিক উপযোগ রেখা।

UU রেখা OX অক্ষকে F বিন্দুতে ছেদ করে OX অক্ষের নিচে নেমে গেছে। অর্থাৎ F বিন্দুর পরে UU রেখার যে কোন বিন্দুর উলম্ব মান ঋণাত্মক।

সুতরাং, F এর পরে ভোগ বাড়ালে প্রান্তিক উপযোগ ঋণাত্মক হবে।

উপরের রেখাচিত্র বিশ্লেষণে আমরা কি দেখতে পেলাম? আমরা দেখলাম প্রান্তিক উপযোগ রেখা ডান দিকে নিম্নগামী। অর্থাৎ, ভোগ বৃদ্ধি পেলে প্রান্তিক উপযোগ ক্রমশ হ্রাস পায়।

প্রান্তিক উপযোগ রেখার নিম্নগতি ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ প্রকাশ করে।

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির ব্যতিক্রম বা সীমাবদ্ধতা

এ বিধি সব ক্ষেত্রে কার্যকরী হয় না। এর কার্যকারীতা কতগুলি শর্তসাপেক্ষ বা অবস্থার উপর নির্ভরশীল। অর্থনীতির অপরাপর নিয়মের মত ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিও “অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত” থাকলেই শুধু কার্যকর ধরা যায়।

নিম্নে এ বিধির কার্যকারীতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হলো –

  1. মানুষের অভ্যাস, রুচি ও আয় অপরিবর্তিত থাকলে এ বিধি কার্যকর হবে। এগুলির কোন একটির পরিবর্তন হলে এ বিধি কার্যকর হয় না। কিন্তু আমরা জানি মানুষের অভ্যাস, রুচি ও আয় পরিবর্তনশীল চলক। এগুলিকে স্থির ধরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্রমহ্রাসমান উপযোগ বিধি কার্যকর বিবেচনা করা হয়।
  2. দ্রব্যের একক পর্যাপ্ত না হলে এ বিধি কার্যকর হবে না। যেমন – তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিকে যদি প্রতিবারে এক চা চামচ পরিমান করে পানি দেয়া হয় তবে প্রান্তিক উপযোগ না কমে তা বাড়তে থাকবে। প্রথম চামচ পানি থেকে যে উপযোগ পাবে ২য় চামচ পানি থেকে তার কম উপযোগ পাবে না। এক্ষেত্রে একক যদি গ্লাস বা বোতল হয় তখন পরবর্তী এককের উপযোগ কমতে পারে।
  3. এ বিধিটি কেবল স্বল্প কালের জন্য প্রযোজ্য। ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিতে অনুমান করা হয় যে, কোন দ্রব্যের বিভিন্ন এককের ভোগ একটি নির্দিষ্ট (স্বল্প, দীর্ঘ নয়) সময়ের মধ্যে ঘটছে।
  4. কোন দ্রব্যের প্রান্তিক উপযোগ শুধু ঐ দ্রব্যের ভোগের উপর নির্ভর করে না, বরং তা পরিবর্তক ও পরিপূরক দ্রব্যের যোগানের উপরও নির্ভর করে। যেমন – কফির দাম হ্রাস পেলে চায়ের উপযোগ কমে যায়, মোটর গাড়ীর উপযোগ জ্বালানী তেল প্রাপ্তির উপর নির্ভরশীল।
  5. শখের দ্রব্যের ক্ষেত্রে এ বিধি প্রযোজ্য নয়। যেন – পুরনো ডাকটিকিট, পুরাতন ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রহের আকাঙ্খা হ্রাস না পেয়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
  6. অনুকরণপ্রিয়তা ভোক্তার আচরণ প্রভাবিত করে এবং সেক্ষেত্রে বিধিটির ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন – কাউকে নতুন শাড়ি বা গয়না কিনতে দেখলে অনেকেই তা অনুসরণ করে থাকে।
  7. অর্থ বা সম্পদের ক্ষেত্রে এ বিধিটি অনেক সময় কার্যকরী হয় না। যেমন – কৃপনের নিকট সঞ্চয়ের ইচ্ছা হ্রাস পায় না, বিষয়ীর নিকট সম্পদের উপযোগ কমে না বরং বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সুতরাং, দেখা যায় যে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি কতগুলি শর্তের উপর নির্ভরশীল। এ শর্তগুলি প্রতিপালিত হলেই এ বিধিটি প্রযোজ্য হবে অন্যথায় নয়।

 

ভোক্তার ভারসাম্যঃ দাম ও প্রান্তিক উপযোগের সম্পর্ক

Consumer’s Equilibrium: Relation Between Price and Marginal Utility

ভোক্তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোগের মাধ্যমে সর্বোচ্চ উপযোগ প্রাপ্তি। এজন্য ভোক্তা প্রাথমিক পর্যায়ে ভোগ বাড়াতে থাকে। মোট উপযোগও বাড়তে থাকে। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে ভোক্তা কোন দ্রব্যের সর্বোচ্চ উপযোগ স্তরে পৌছে। ভোক্তার সর্বোচ্চ উপযোগের অবস্থাকে বলা হয় ভোক্তার ভারসাম্য অবস্থা। আর ভোগের যে স্তরে এসে ভোক্তা তার উপযোগ সর্বোচ্চ করতে পারে সেই স্তরকে বলা হয় ভারসাম্য। ভোক্তার ভারসাম্য অর্জনের পূর্বে যে কোন স্তরে ভোক্তা তার ভোগ বাড়াতে থাকে কিন্তু ভারসাম্য অর্জনের পর ভোক্তা আর ভোগ বাড়ায় না।

ভোক্তার ভারসাম্য অর্জনের অনুমিত শর্ত (Assumptions):

ভোক্তার ভারসাম্য নিম্নোক্ত অনুমিত শর্তসমুহের উপর নির্ভরশীল –

  • ভোক্তার আচরণ যুক্তিশীল। অর্থাৎ, ভোক্তা বিবেকবান।
  • ভোক্তার আয় সীমিত।
  • ভোক্তার রুচি, পছন্দ ও অভ্যাস স্থির।
  • দ্রব্যমূল্য স্থির। অর্থাৎ, সকল ভোক্তার নিকট দ্রব্যমূল্য সমান।
  • দ্রব্যের এককসমুহ সমজাতীয়।
  • উপযোগ সংখ্যাবাচক এবং প্রান্তিক উপযোগ ক্রমহ্রাসমান।

বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত অনুমিত শর্তগুলোর সাপেক্ষে একজন ভোক্তার উপযোগ সর্বোচ্চকরণ ২টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যথাঃ-

  1. প্রান্তিক উপযোগ (MU) এবং
  2. দাম (P)।

যুক্তিশীল ভোক্তা প্রান্তিক উপযোগ ও দামের মধ্যে তুলনা করে ভোগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

যদি প্রান্তিক উপযোগ ও দাম সমান (MU = P) তাহলে ভোক্তার উপযোগ সর্বোচ্চ হবে; ভোক্তা ভারসাম্য লাভ করবে।

যদি প্রান্তিক উপযোগ দামের থেকে বেশি (MU > P) হয় তাহলে ভোক্তা ভোগ বাড়াবে।

আবার, যদি প্রান্তিক উপযোগ দামের থেকে কম (MU < P) হয় তখন ভোক্তা ভোগ কমাবে।

একমাত্র ভোগের যে স্তরে MU = P হয়, সেখানেই ভোক্তা ভারসাম্য লাভ করবে। তবে, এই শর্তটি প্রয়োজনীয় কিন্তু যথেষ্ট নয়।

ভারসাম্য বিন্দুতে অবশ্যই প্রান্তিক উপযোগ ক্রমহ্রাসমান থাকবে অর্থাৎ প্রান্তিক উপযোগ রেখা বামদিক থেকে ডানদিকে নিম্নগামী হবে।

উপরের আলোচনা থেকে ভোক্তার ভারসাম্যের জন্য ২টি শর্ত আরোপ যোগ্য –

  1. প্রথম বা প্রযোজনীয় শর্তঃ MU = P হতে হবে। অর্থাৎ, প্রান্তিক উপযোগ ও বাজার দাম পরস্পর সমান হতে হবে।
  2. দ্বিতীয় বা পর্যাপ্ত শর্তঃ MU ক্রমহ্রাসমান হবে। অর্থাৎ, প্রান্তিক উপযোগ রেখা বাজার দামকে উপর থেকে ছেদ করে নীচের দিকে নামবে।

নিচের চিত্রের সাহায্যে ভোক্তার ভারসাম্য ব্যাখ্যা করা হলো –

ভোক্তার ভারসাম্য

চিত্রঃ   ভোক্তার ভারসাম্য

চিত্রের OX অক্ষে দ্রব্যের পরিমান এবং OY অক্ষে প্রান্তিক উপযোগ ও দাম ধরা হয়েছে। দ্রব্যের মূল্য স্থির ধরা হয়েছে বলে দাম রেখা PP ভূমি অক্ষের সমান্তরাল। MU রেখা হচ্ছে প্রান্তিক উপযোগ রেখা।

S বিন্দুতে MU = P এবং MU রেখা নিচ থেকে ছেদ করে উপরে উঠছে। অর্থাৎ, MU ক্রমবর্ধমান। তাই S বিন্দুতে ভারসাম্যের দ্বিতীয় শর্ত পূরণ হয়নি। কাজেই S বিন্দুতে ভোক্তার ভারসাম্য অর্জিত হবে না। তাই OM এর পরেও ভোক্তা তার ভোগ অব্যাহত রাখবে।

T বিন্দুতে MU = P এবং MU রেখা নিম্নগামী অর্থাৎ, MU ক্রমহ্রাসমান। তাই T বিন্দুতে ভোক্তা ভারসাম্য লাভ করবে।

অর্থাৎ, ভোক্তা যদি OP দামে OM পরিমান দ্রব্য ভোগ করে তাহলে S বিন্দুতে ভোক্তা প্রান্তিক উপযোগ ও দামের সমতা ভোগ করবে কিন্তু MU রেখা উর্দগামী হওয়ায় ভোক্তার ভারসাম্য অর্জিত হবে না।

আবার, ভোক্তা যদি P দামে OM1 দ্রব্য ভোগ করে, তখন T বিন্দুতেও ভোক্তার উপযোগ ও দামের সমতা অর্জিত হবে; সেই সাথে MU রেখা উপর থেকে PP ছেদ করে নিম্নগামী হবে। অর্থাৎ, T বিন্দুতে ভোক্তার প্রান্তিক উপযোগ দামের সমান এবং ক্রমহ্রাসমান।

তাই, S নয়, T বিন্দুতে ভোক্তার ভারসাম্য অর্জিত হবে।

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি থেকে চাহিদা রেখা অংকন

Derivation of Demand Curve from Law of Diminishing Marginal Utility

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি ও চাহিদা বিধির মধ্যে নিগুঢ় সম্পর্ক রয়েছে।

আমরা আগে দেখেছি ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি অনুযায়ী অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভোক্তা একটি দ্রব্য যতই ভোগ করতে থাকবে ততই তার নিকট এর প্রান্তিক উপযোগ হ্রাস পেতে থাকবে।

অন্যদিকে, চাহিদা বিধি অনুযায়ী অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে কোন দ্রব্যের দাম কমলে এর চাহিদা বাড়ে এবং দাম বাড়লে চাহিদা কমে।

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধিতে ভোগ্য দ্রব্যের একক বৃদ্ধির সাথে প্রান্তিক উপযোগ হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, দ্রব্যের একক বৃদ্ধির সাথে প্রান্তিক উপযোগের বিপরীত সম্পর্ক।

মার্শালের উপযোগ বিধিতে আরও প্রকাশ পায় যে, ভোক্তার ভারসাম্য অর্জনের ক্ষেত্রে অর্থের প্রান্তিক উপযোগ স্থির সাপেক্ষে দ্রব্যের প্রান্তিক উপযোগ ও দাম পরস্পর সমান হয়।

প্রান্তিক উপযোগ ও দামের সমতা স্থলে নির্ধারিত হয় দ্রব্যের একক বা একক সমুহের প্রতি চাহিদা।

দ্রব্যের এককের সাথে প্রান্তিক উপযোগের যেহেতু বিপরীত সম্পর্ক, আর প্রান্তিক উপযোগ ও দাম যেহেতু সমান, তাই একথা বলা যায় যে, দ্রব্যের এককের সাথে দামেরও বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে।

চাহিদা বিধিতে দামের সাথে দ্রব্যের এককের চাহিদার বিপরীত সম্পর্কের কথাই বলা হয়েছে।

সুতরাং, ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি ও চাহিদা বিধি পরস্পর নিকট সম্পর্কে আবদ্ধ।

প্রান্তিক উপযোগ রেখা ডান দিকে নিম্নগামী, অনুরূপভাবে চাহিদা রেখাও ডানদিকে নিম্নগামী। প্রান্তিক উপযোগ রেখা থেকেই চাহিদা রেখা পাওয়া যায়।

নিম্নের চিত্রের সাহায্যে তা ব্যাখ্যা করা হলো –

ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি থেকে চাহিদা রেখা অংকন

চিত্রঃ ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি থেকে চাহিদা রেখা অংকন

চিত্র-I এ OX অক্ষে দ্রব্যের একক এবং OY অক্ষে দাম ও অর্থের প্রান্তিক উপযোগ নির্দেশ করা হয়েছে। অর্থের প্রান্তিক উপযোগ স্থির। কেবল দামের পরিবর্তন ঘটে।

OY অক্ষে দ্রব্যের দাম ও উপযোগ পরিমাপ করা হয়।

II নং চিত্রে OX অক্ষে দ্রব্যর চাহিদার পরিমান এবং OY অক্ষে দ্রব্যের দাম পরিমাপ করা হয়েছে।

DD হচ্ছে X দ্রব্যের চাহিদা রেখা।

P1 λ এর ক্ষেত্রে ভোক্তা OM পরিমান দ্রব্য ক্রয় করে। এ অবস্থায় প্রাথমিক ভারসাম্য অর্জিত হয়। কারণ, OM দ্রব্যের একক থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগ AM এবং P1 λ পরস্পর সমান।

এখন দাম কমে P2 λ হলে ভারসাম্য রক্ষার্থে দ্রব্য ক্রয়ের পরিমান বাড়িয়ে ON করা প্রয়োজন। এর ফলে প্রান্তিক উপযোগ হয় BN, তা আবার P2 λ এর সমান।

কাজেই, দাম কমলে দ্রব্য ক্রয়ের পরিমান বাড়িয়ে প্রান্তিক উপযোগ কমানো হয়। যাতে ভোক্তা আবার ভারসাম্য লাভ করতে পারে।

অর্থাৎ, দাম কমলে চাহিদার পরিমান বাড়ে। এ বক্তব্যটি চাহিদা বিধি সম্পর্কিত। আর চাহিদা বিধির জ্যামিতিক প্রকাশই চাহিদা রেখা।

চিত্রের II অংশে তা দেখানো হয়েছে। এই চিত্রে P1 দামে চাহিদার পরিমান OM যা e বিন্দুর দ্বারা প্রকাশ পায়। P2 দামে চাহিদার পরিমান ON তা f বিন্দু দ্বারা নির্দেশিত। e ও f বিন্দুগুলি যোগ করে DD চাহিদা রেখা পাওয়া যায়। MUx রেখার রূপান্তর হলো DD চাহিদা রেখা।

MUx ডানদিকে নিম্নগামী হওয়ায় চাহিদা রেখাও ডানদিকে নিম্নগামী। MUx রেখা ডানদিকে নিম্নগামী হওয়ার পিছনে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি কার্যকর।

কাজেই চাহিদা রেখা ডানদিকে নিম্নগামী হওয়ার পিছনে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির প্রভাব অনস্বীকার্য।